কোরআনের বাংলা তাফসির ইবনে কাসির
ফাতিহা শব্দের অর্থ এবং বিভিন্ন নাম
এই সূরাটির নাম সূরা আল্ ফাতিহা। কোন কিছু আরম্ভ করার নাম ফাতিহা বা উদ্ঘাটিকা। কুরআনুল হাকীমের প্রথমে এই সূরাটি লিখিত হয়েছে বলে একে সূরা আল ফাতিহা বলা হয়।
তাছাড়া নামাজের মধ্যে এর দ্বারাই তিলাওত আরম্ভ করা হয় বলেও একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে। উম্মুল কিতাব ও এর অপর একটি নাম। জামহুর বা অধিকাংশ ইমামগণ এ মতই পােষণ করে থাকেন।
তিরমিযীর একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ এই সূরাটি হল উম্মুল কুরআন, উম্মুল কিতাব, সাবআ মাসানী এবং কুরআন আযীম। এই সূরাটির নাম ‘সূরাতুল হামদ' এবং সূরাতুস্ সালাত'ও বটে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি সালাতকে (অর্থাৎ সূরা ফাতিহাকে) আমার মধ্যে এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে দিয়েছি। যখন বান্দা বলে আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।' (তিরমিযী ৮/২৮৩)
এই হাদীছ লটি দ্বারা বুঝা যায়, সূরা ফাতিহার অন্য নাম সূরাহ ই সালাত ও বটে। কেননা সূরা ফাতিহাটি নামাজের মধ্যে পাঠ করার শর্ত রয়েছে। এই সূরার আর একটি নাম সূরাতুশ শিফা।
এর আর একটি নাম ‘সূরাতুর রুকিয়্যাহ'। আবু সাঈদ (রাঃ) সাপে কাটা রুগীর উপর ফু দিলে সে ভাল হয়ে যায়। এ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘এই সূরা যে রুকিয়্যাহ ( পড়ে ফুক দেওয়ার সূরা) তা তুমি কি করে জান?' (ফাতহুল বারী ৪/৫২৯)
ইব্ন আব্বাস (রাঃ), কাতাদাহ (রহঃ) এবং আবুল আলীয়া (রহঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাক্কী। কেননা এক আয়াতে আছে
ولقد اتيتك بها بين الماني والقرءان العظيم আমি তাে তােমাকে দিয়েছি সাত আয়াত যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয় এবং দিয়েছি মহান কুরআন। (সূরা হিজর, ১৫-৮৭) আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সূরা ফাতিহায় আয়াত, শব্দ ও অক্ষরের সংখ্যা
এই সূরার আয়াত সম্পর্কে সবাই একমত। সূরা ফাতিহার আয়াত হল সাতটি। এই সূরার পৃথক কোন আয়াত কিনা সে বিষয়েও মতভেদ রয়েছে।
সমস্ত কারী, সাহাবী এবং তাবেঈদের একটি বিরাট দল এবং পরবর্তী যুগের অনেক বৃদ্ধ মুরব্বী একে সূরা ফাতিহার প্রথম, পূর্ণ একটি পৃথক আয়াত বলে থাকেন।
এই সূরার শব্দ পঁচিশ টি এবং অক্ষর একশত তের টি। সূরা ফাতিহা কে উম্মুল কিতাব বলার কারণ হল- ইমাম বুখারী সহীহ বুখারী এর ‘কিতাবুত তাফসীরে’ লিখেছেন ও এই সূরাটির নাম উম্মুল কিতাব' রাখার কারণ এই যে, কুরআন মাজীদের লিখন এ সূরা হতেই আরম্ভ হয়ে থাকে এবং সালাতের কিরাআতও এ থেকেই শুরু হয়। (ফাতহুল বারী ৮/৬)
একটি অভিমতে এটাও আছে যে, যেহেতু পূর্ণ কুরআনুল কারীমের বিষয়াবলী সংক্ষিপ্তভাবে এই সূরার মধ্যে নিহিত রয়েছে, সেহেতু এই সূরার নাম উম্মুল কিতাব রাখা হয়েছে।
ইন জারীর (রহঃ) বলেনঃ আরাব দেশের মধ্যে এ প্রথা চালু আছে যে, তারা একটি ব্যাপক কাজ বা কাজের মূলকে ওর অধীনস্থ শাখাগুলির ‘উম্ম’ বা ‘মা’ বলে থাকে।
যেমন: তারা সেই চামড়াকে বলে, যা সম্পূর্ণ মাথাকে ঘিরে রয়েছে। আর সামরিক বাহিনীর পতাকাকেও তারা বলে থাকে, যার নীচে জনগণ একত্রিত বা জমায়েত হয়।
মাক্কা নগরীকে উম্মুল কুরা বলার কারণ, এটাই সারা বিশ্ব জাহানের প্রথম ঘর। বলা হয়, পৃথিবী সেখান হতেই ব্যাপ্তি এবং বিস্তার লাভ করেছে। (তাবারী ১/১০৭)
মুসনাদ আহমাদে আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘উম্মুল কুরা’ সম্পর্কে বলেছেন ও ‘এটাই ‘উম্মুল কুরআন এটাই ‘সাবআ মাসানী’ এবং এটাই কুরআনুল আযীম।' (আহমাদ ২/৪৪৮)
অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘ইহাই ‘উম্মুল কুরআন, ইহাই ‘ফাতিহাতুল কিতাব এবং ইহাই ‘সাবআ’ মাসানী।' (তাবারী ১/১০৭)
সূরা ফাতিহার ফাযীলত
মুসনাদ আহমাদে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি সালাত আদায় করছিলাম, এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডাক দিলেন, আমি কোন উত্তর দিলাম না।
নামাজ শেষ করে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেন এতক্ষণ তুমি কি করছিলে?
আমি বললামঃ হে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি সালাত আদায় করছিলাম।
তিনি বললেনঃ আল্লাহর সেই নির্দেশ কি তুমি শুননি? "হে মুমিনগণ! তােমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও যখন তিনি তােমাদেরকে তােমাদের জীবন সঞ্চারের দিকে আহ্বান করেন।" (সূরা আনফাল, ৮ ও ২৪)
মাসজিদ হতে যাবার পূর্বেই আমি তােমাকে বলে দিচ্ছি, পবিত্র কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সূরা কোনটি।
এরপর তিনি (হযরত মুহাম্মাদ সাঃ) আমার হাত ধরে মসজিদ থেকে চলে যাবার ইচ্ছা পোষণ করলে আমি তাঁকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে দিলাম।
তিনি বললেনঃ সে সূরাটি হল ‘আল হামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন'। এইটাই সাবআ মাসানী এবং এইটাই কুরআন আযীম, যা আমাকে দেয়া হয়েছে।' (আহমাদ ৪/২১১)
একই ভাবেই এই বর্ণনা টি সহীহ বুখারী, আবু দাউদ, নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ ও অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে। (হাদীস নং ৮-৬, ২৭১; ২-১৫০, ২-১৩৯ এবং ২-১২৪৪)
মুসনাদ আহমাদে আরও রয়েছে, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উবাই ইব্ন কাবের (রাঃ) নিকট যান যখন তিনি সালাত আদায় করছিলেন।
অতঃপর তিনি বলেনঃ হে উবাই (রাঃ)! তিনি তাঁর ডাকের প্রতি মনােযােগ দেন কিন্তু কোন উত্তর দেননি। আবার তিনি বলেনঃ হে উবাই!
তিনি বলেনঃ ‘আসসালামু আলাইকা।' আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ ওয়াআলাইকাস সালাম।তারপর বলেনঃ হে উবাই! আমি তােমাকে ডাক দিলে উত্তর দাওনি কেন?' তিনি বলেনঃ“হে আল্লাহর নবী (সাঃ)! আমি নামাজ আদায় করছিলাম।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তখন উপরােক্ত আয়াতটিই পাঠ করে বলেন : তুমি কি এই আয়াতটি শুন নি?
তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! হ্যা (আমি শুনেছি), এরূপ কাজ আর আমার দ্বারা হবেনা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি কি চাও যে, তােমাকে আমি এমন একটি সূরার কথা বলি যার মত কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনে নেই?
তিনি বলেনঃ হ্যা। অবশ্যই বলুন। তিনি বলেনঃ এই স্থান ত্যাগ করার পূর্বেই আমি তােমাকে তা জানিয়ে দিব।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাত ধরে চলতে চলতে অন্য কথা বলতে থাকেন, আর আমি ধীর গতিতে চলতে থাকি।
এই ভয়ে যে না জানি কথা বলা বাকি থেকে যায়, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাড়ীতে পৌছে যান।
অবশেষে দরজার নিকট পৌছে আমি তাঁকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেই। তিনি বললেনঃ ‘সালাতে কি পাঠ কর? আমি উম্মুল কুরা’ পাঠ করে শুনিয়ে দেই।
তিনি বললেনঃ ‘সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এরূপ কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুরের মধ্যে নেই যা কুরআনে রয়েছে। এটাই হল ‘সাবআ’ মাসানী'। (আহমাদ ২/৪১২, তিরমিযী ৮/২৮৩, হাকিম ১/৫৬০)
জামে'উত তিরমিযীতে আরও একটু বেশি বর্ণিত আছে। তা হল এটাই মহান কুরআন যা আমাকে দান করা হয়েছে। এই হাদীসটি সংজ্ঞা ও পরিভাষা অনুযায়ী হাসান ও সহীহ।
আনাস (রাঃ) হতেও এ অধ্যায়ে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। মুসনাদ আহমাদেও এভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) একে পরিভাষার প্রেক্ষিতে হাসান গারীব বলে থাকেন।
মুসনাদ আহমাদে আবদুল্লাহ ইবন যাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গমন করি।
সে সময় সবেমাত্র তিনি সৌচক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। আমি তিনবার সালাম দেই, কিন্তু তিনি উত্তর দিলেননা। তিনি বাড়ীর মধ্যেই চলে গেলেন।
আমি দুঃখিত ও মর্মাহত অবস্থায় মাসজিদে প্রবেশ করি। অল্পক্ষণ পরেই পবিত্র হয়ে তিনি আগমন করেন এবং তিনবার সালামের জবাব দেন।
অতঃপর বলেন, “হে আবদুল্লাহ ইবন যাবির! জেনে রেখ, সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে সর্বোত্তম সূরা হল " আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন" এই সূরাটি। (আহমাদ ৪/১৭৭, মুআত্তা ১/৮৪) এর ইসনাদ খুব চমৎকার।
সূরা ফাতিহার মর্যাদার ব্যাপারে উপরে উল্লিখিত হাদীছ ছাড়াও আরও হাদীছ রয়েছে।
সহীহ বুখারীতে ‘ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়ে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ একবার আমরা সফরে ছিলাম।
এক স্থানে আমরা অবতরণ করি। হঠাৎ একটি দাসী এসে বললঃ এ এলাকার গােত্রের নেতাকে সাপে কেটেছে।
আমাদের লােকেরা এখন সবাই অনুপস্থিত। ঝাড় ফুক দিতে পারে এমন কেহ আপনাদের মধ্যে আছে কি?
আমাদের মধ্য হতে একটি লােক তার সাথে গেল। সে যে ঝাড় ফুঁকও জানত তা আমরা জানতামনা। সেখানে গিয়ে সে কিছু ঝাড় ফুঁক করল।
আল্লাহর অপার মহিমায় তৎক্ষণাৎ সে সম্পূর্ণরূপে আরােগ্য লাভ করল। অতঃপর সে ৩০টি ছাগী দিল এবং আমাদের আতিথেয়তার জন্য অনেক দুধও পাঠিয়ে দিল।
সে ফিরে এলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তােমার কি এ বিদ্যা জানা ছিল' সে বললঃ আমিতাে শুধু সূরা ফাতিহা পড়ে কুঁক দিয়েছি।
আমরা বললামঃ তাহলে এ প্রাপ্ত মাল এখনই স্পর্শ করনা। প্রথমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করে নেই।
মাদীনায় এসে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন ‘এটা যে ফুক দেয়ার সূরা তা সে কি করে জানল? এই মাল ভাগ করে আমার জন্য এক ভাগ রেখ। (ফাতহুল বারী ৮/৬৭১)
সহীহ মুসলিম ও সুনান নাসাঈতে আছে যে, একদা জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বসেছিলেন, এমন সময় উপর হতে এক বিকট শব্দ এলাে।
জিবরাঈল (আঃ) উপরের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ আজ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেছে যা ইতােপূর্বে কখনও খুলেনি।
অতঃপর সেখান হতে একজন মালাক/ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, আপনি খুশি হােন!
এমন দু'টি নূর আপনাকে দেয়া হল যা ইতােপূর্বে কেহকেও দেয়া হয়নি। তা হল সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারাহ এর শেষ আয়াতগুলি। ওর এক একটি অক্ষরের উপর নূর রয়েছে। এটি সুনান নাসাঈর শব্দ